Home / BCS Tips / প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা একসাথে প্রস্তুতি নিন :: আন্তর্জার্তিক বিষয়াবলি

প্রিলি, লিখিত ও ভাইভা একসাথে প্রস্তুতি নিন :: আন্তর্জার্তিক বিষয়াবলি

জাতিসংঘ সম্পর্কে বিস্তারিত
লিখেছেন > Samad Azad
★ সম্ভাব্য প্রশ্ন:
১। জাতিসংঘ সম্পর্কে কিছু তথ্য :
প্রতিষ্ঠা, সদস্য সংখ্যা, সদর দপ্তর, মহাসচিব, ভাষা, ইত্যাদি।
২। জাতিসংঘ গঠনের প্রেক্ষাপট আলোকপাত করুন।
৩। জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামো বিধৃত করুন।
৪। জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করুন।
৫। জাতিসংঘের সাফল্য ও ব্যর্থতা আলোচনা করুন।
৬। সাধারণ পরিষদ গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলি বর্ণনা করুন।
৭। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন, আলোচ্যসূচি, ভোটদান ও
কার্য পরিচালনার পদ্ধতি উল্লেখ করুন।
৮। ১৯৫০ সালে গৃহীত ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ এর মূল
বিষয়বস্তু আলোকপাত করুন।
৯। ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ কিভাবে সাধারণ পরিষদের
মর্যাদা বৃদ্ধি ও এর এখতিয়ার সম্প্রসারিত করেছে? এই
প্রস্তাবের ইতিবাচক দিকসমূহ উল্লেখ করুন।
১০। বাংলাদেশের ‘শান্তির সংস্কৃতি প্রস্তাব’ জাতিসংঘে গৃহীত
বিষয়ে যা জানুন লিখুন।
.
✏ ✏ ✏ ✏ ✏✏ ✏ ✏ ✏
উত্তর :: উত্তর :: উত্তর :: উত্তর
✏ ✏ ✏ ✏ ✏✏ ✏ ✏ ✏
.
★ জাতিসংঘ :
জাতিসংঘ (রাষ্ট্রসংঘ) বিশ্বের জাতিসমূহের একটি সংগঠন যার
লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন, নিরাপত্তা,
অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং মানবাধিকার বিষয়ে
পারষ্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ৫১টি রাষ্ট্র কর্তৃক
সনদ স্বাক্ষর করার মাধ্যমে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর
জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত
লীগ অফ নেশন্সের স্থলাভিষিক্ত হয়।
জাতিসংঘ শব্দটির প্রবর্তক হলেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি
ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট। জাতিসংঘ একটি রাজনৈতিক সংগঠন। এর ব্যাপক
কর্মপ্রক্রিয়া মূলত রাজনীতির বৃত্তেই প্রস্ফুটিত।
.
★ সদস্য সংখ্যা :
জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বিশ্বের প্রায় সব স্বীকৃত
রাষ্ট্রই এর সদস্য। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো
তাইওয়ান ও ভ্যাটিকান সিটি। এছাড়া অন্যান্য কিছু অস্বীকৃত এলাকার
মধ্যে রয়েছে ট্রান্সনিস্ট্রিয়া ও উত্তর সাইপ্রাসের তুর্কী
প্রজাতন্ত্র। জাতিসংঘে যোগদানকারী সর্বশেষ সদস্য
রাষ্ট্র হলো দক্ষিণ সুদান (২০১১ সালের ১৪ জুলাই, ১৯৩তম)
যোগদান করে।
.
★ সদর দপ্তর :
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটনে জাতিসংঘের সদর
দপ্তর অবস্থিত। এটি ১৬ একর জমিতে ভবনটি ইস্ট নদীর
তীরে অবস্থিত। সদর দপ্তর স্থাপনের জমি কেনার জন্য
জন ডি রকফেলার জুনিয়র ৮.৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। তিনি
জাতিসংঘকে এই জমি দান করেন। সদর দপ্তরের মূল ভবনটির
নকশা প্রণয়ন করেন – লে করবুসিয়ে, অস্কার নিয়েমেয়ার
সহ আরো অনেক খ্যাতনামা স্থপতি। নেলসন
রকফেলারের উপদেষ্টা ওয়ালেস কে হ্যারিসন এই স্থপতি
দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সদর
দপ্তরের উদ্বোধন হয়। ১৯৪৯ সালের আগে পর্যন্ত
লন্ডন ও নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে জাতিসংঘের কার্যালয়ের
অবস্থান ছিল। নিরাপত্তার খাতিরে জাতিসংঘের কার্যালয়ে
প্রেরিত সকল ধরণের চিঠিপত্র পরীক্ষণ-নিরীক্ষণসহ
জীবাণুমুক্ত করা হয়।
জাতিসংঘের সদর দপ্তরের ঠিকানা হল ……
760 United Nations Plaza, NewYork City, NY 10017, USA.
.
★ ভাষা :
জাতিসংঘের অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক ভাষা ৬ টি: ইংরেজি, ফরাসি,
স্পেনীয়, আরবি, চীনা, রুশ ভাষা। জাতিসঙ্ঘ বা রাষ্ট্রসঙ্ঘের
সচিবালয়ে ২টিভাষা ব্যবহৃত হয়: ইংরেজি ও ফরাসি। জাতিসংঘের
অফিসিয়াল বা দাপ্তরিক ভাষাগুলোর মধ্যে ইংরেজি ৫২টি সদস্য
দেশের সরকারী ভাষা। ফরাসি হলো ২৯টি দেশের, আরবি
২৪টি দেশের, স্পেনীয় ২০টি দেশের, রুশ ৪টি
দেশের, এবং চীনা ভাষা ২টি দেশের সরকারি ভাষা।
.
★ মহাসচিব :
জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মহাসচিবকে
“প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা” হিসেবে উল্লেখ করা
হয়েছে। সনদে আরো বলা হয়েছে যে, মহাসচিব যে-
কোন বিশ্ব শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা ও নিরাপত্তার খাতিরে
কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদে
প্রস্তাব আনতে পারবেন। মহাসচিব পদটি দ্বৈত ভূমিকার
অধিকারী – জাতিসংঘের প্রশাসক এবং কুটনৈতিক ও
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। নিরাপত্তা পরিষদের
সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে জাতিসংঘের সাধারণ
পরিষদ মহাসচিব নিযুক্ত করেন। এক বা দুই মেয়াদে ৫ বছরের
জন্য ভৌগোলিক চক্রাবর্তে মহাসচিব পদে মনোনীত
করার বিধান চলে আসছে। বর্তমানে মহাসচিব পদে
রয়েছেন পর্তুগালের নাগরিক অ্যান্তনি গুতেরেস
..
★ জাতিসংঘ গঠনের প্রেক্ষাপট :
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব নেতারা যুদ্ধ বন্ধ এবং শান্তি ও
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য লিগ অব নেশন্স গঠন করেন।
সংঘর্ষ ও উত্তেজনা রোধে সংস্থাটি কার্যকর ভূমিকা পালনে
ব্যর্থ হয়। ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধের
ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবলীলা এবং সৃষ্ট মানবতার বিপর্যয় বিশ্ব
নেতাদের শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে
পদক্ষেপ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
শেষে বিজয়ী মিত্রশক্তি পরবর্তীকালে যাতে যুদ্ধ ও
সংঘাত প্রতিরোধ করা যায় এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা
করতে উদ্যোগী হয়। একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক সংগঠন
গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় নানা ধরনের পদক্ষেপ গৃহীত
হয় এবং লিগ অব নেশন্স-এর ধ্বংস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪১ সালের জুন থেকে ১৯৪৫
সালের জুন পর্যন্ত বিশ্ব নেতাদের নানা প্রচেষ্টায় এবং
গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে
জাতিসংঘ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য
(যাদের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা আছে) মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও গণচীন হলো
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী দেশ।
.
★ জাতিসংঘের উদ্দেশ্য :
জাতিসংঘ সনদের প্রস্তাবনা এবং ১নং অনুচ্ছেদে সংস্থাটির
উদ্দেশ্যসমূহ বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
১. বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা,
২. পৃথিবীর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ক স্থাপন,
৩. মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাবলী
নিরসনের দ্বারা সৃষ্ট বাধ্যবাধকতার প্রতি সুবিচার ও সম্মান
প্রদর্শন করা এবং জাতিসংঘকে রাষ্ট্রসমূহের ক্রিয়া-কলাপের
কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা।
.
★ জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামো :
সনদের ৭ নং ধারায় উল্লিখিত এই ৬টি সংস্থা হল:
১) সাধারণ পরিষদ ( The General Assembly);
২) নিরাপত্তা পরিষদ ( The Security Council);
৩) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ( The Economic and Social
Council);
৪) অছি পরিষদ ( The Trusteeship Council);
৫) আন্তর্জাতিক বিচারালয় ( The Internation Court of Justice)
এবং
৬) সচিবালয় (The Secretariat)।
এছাড়াও জাতিসংঘ সনদে কয়েকটি সহায়ক সংস্থা এবং বিশেষ
উদ্দেশ্যসাধক সংস্থা গঠনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে
এই ধরনের কয়েকটি সংস্থা হল: ইউনেস্কো, খাদ্য ও
কৃষিসংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি এবং
অন্যান্য।
.
★ জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর :: সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর
থেকে সংস্থাটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,
সদস্য দেশগুলোর পরস্পরের প্রতি সন্দেহ এবং অবিশ্বাস
জাতিসংঘের স্বাধীন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে
চলেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাতিসংঘ কোনো
কোনো ক্ষেত্রে সফলতার পরিচয় দিয়েছে, আবার
অনেক ক্ষেত্রেই দিয়েছে ব্যর্থতার পরিচয়।
.
সফলতা :
৭০ বছরের ইতিহাসে জাতিসংঘের সফলতার পরিসংখ্যান
একেবারে কম নয়। ১৯৪৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি
১৮৬ টি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে কার্যকর ভূমিকা
রেখেছে। এতে অবসান হয়েছে অনেক আঞ্চলিক
সংঘাতের। জাতিসংঘ তার নীরব কূটনীতির মাধ্যমে ৮০টিরও
বেশি আসন্ন যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়েছে। জাতিসংঘ
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটির মূল্যবোধ ও কার্যকর
পদক্ষেপের কারণে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বড়
ধরনের কোনো সংঘাত হয়নি। সংস্থাটি ৫০টিরও বেশি
দেশের স্বাধীনতা অর্জনে পালন করেছে সক্রিয় ভূমিকা।
নব্বইয়ের দশকে নামিবিয়া, এলসালভেদর, মোজাম্বিক ও
কম্বোডিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অবদান উল্লেখযোগ্য।
১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের উদ্যোগে
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। এটি
নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। দু বার বিশ্ব মানবাধিকার
সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক
পদক্ষেপ নিয়েছে জাতিসংঘ।
.
১৯৫০ সালে সৃষ্ট কোরিয়া সংকট, ১৯৫৬ সালে সৃষ্ট সুয়েজ
সংকট, এবং কঙ্গো ও সাইপ্রাস সংকট নিরসনে জাতিসংঘ কার্যকর
ভূমিকা পালন করে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ অবসানে জাতিসংঘ ১৯৮৭
সালের ২৫ জুন ৫৯৮নং প্রস্তাব গ্রহণ করে যুদ্ধবিরতি চুক্তি
স্বাক্ষরে দু দেশকে সহযোগিতা করে। নামিবিয়া ও পূর্ব
তিমুরের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা
উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট, ১৯৯১
সালে ইরাক-কুয়েত সংকট, ১৯৯২ সালে বসনিয়া
হার্জেগোভিনায় এবং সোমালিয়ায় শান্তিরক্ষী বাহিনী
পাঠানোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং
বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী আন্তর্জাতিক
শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় ১৯৮৮
সালে এ বাহিনীকে দেয়া হয় নোবেল পুরস্কার। এছাড়া
পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরস্ত্রীকরণে জাতিসংঘের ভূমিকা
উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ১৯৪৮ সাল
থেকে আজ অবধি বিশ্বে স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখে চলেছে।
.
ব্যর্থতা :
সফলতার পাশাপাশি জাতিসংঘের ব্যর্থতাও কম নয়। স্নায়ুযুদ্ধোত্ত
র পৃথিবীতের জাতিসংঘের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
উঠছে জোরেশোরে। জতিসংঘ আসলে বিশ্বব্যাপী
বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা পারবে কি না এ নিয়ে
প্রশ্ন উঠেছে।
ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যার সমাধান করতে না পারাকে জাতিসংঘের
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সমস্যা
সমাধানে শুধু প্রস্তাব গ্রহণ করেই জাতিসংঘ ক্ষান্ত
থেকেছে। লেবানন সংকট নিরসনে শুধু শান্তিরক্ষী
বাহিনী গঠন করেই জাতিসংঘ তার দায়িত্ব শেষ করেছে।
ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
গ্রহণ করেনি। ১৯৪৮ সালে বার্লিন সমস্যা, ১৯৬২ সালে কিউবান
মিসাইল ক্রাইসিস নিরসনে জাতিসংঘ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন
করেছিল। কসোভো ও বসনিয়া হার্জেগোভিনার যুদ্ধ
বন্ধের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
জাতিসংঘ যদিও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের মাধ্যমে সামাজিক
ও অথনৈতিক উন্নয়নে তৎপর, কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলোর চাপ ও
প্রাধান্য বিস্তারের প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি
করেছে। জাতিসংঘ অনেকটাই বৃহৎ শক্তিগুলোর
ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী
সদস্যদের ভেটো ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার, জাতিসংঘ
সনদের তোয়াক্কা না করা এবং সাধারণ পরিষদকে বিশেষ কিছু
ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলার মানসিকতার কারণে জাতিসংঘ
কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত
রয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন একতরফা হামলায়
জাতিসংঘ দর্শকের ভূমিকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। বিভিন্ন
আঞ্চলিক সংস্থা ও ন্যাটোর মত সামরিক সংগঠন জাতিসংঘের
ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব তৈরি করেছে, যা সংগঠনটির স্বাভাবিক
কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।
বিশ্বায়নের ফলে বিশ্ব আজ উন্নত ও অনুন্নত এই দু
শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে আছে। এ অবস্থায় পৃথিবীব্যাপী
সংঘাত, দারিদ্র্য ও এইডসের মত ভয়াবহ ব্যাধি মোকাবিলায়
জাতিসংঘের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিবর্তিত এ
বিশ্ব ব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্থাটির বর্তমান ব্যর্থতা আর অকার্যকারিতার জন্য এর সাংগঠনি
কাঠামো, প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাসহ বৃহৎ
শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে দায়ী করা হয়। তাই
সংস্থাটির প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার
উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তথা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা
রক্ষায় সংস্থাটি আরও বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করবে – এটাই
সবার প্রত্যাশা।
.
★ জাতিসংঘের সাফল্য ও ব্যর্থতা (একনজরে)
সাফল্যসমূহ :
১। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা
– এ পর্যন্ত ৬৯ টি শান্তি মিশন (১৬ টি চলমান)
– ১৭২ টি আসন্ন যুদ্ধ বন্ধ করা
– ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইন যুদ্ধ বন্ধ করা
– ১৯৮৮ সালে ইরাক ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা
– ১৯৫০ সালে কোরিয়ো সংকট সামাধান করা
– ১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকট মোকাবিলা
– ১৯৯১ সালে ইরাক কুয়েত সংকট মোকাবিলা করা
২। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে: UNDP, UNICEF,
ECOSOCপ্রতিষ্ঠা
৩। উপনিবেশ বিলোপ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: কম্বোডিয়া,
নামিবিয়া, এল সালভাদর, মোজাম্বিক এ গণতন্ত্র উত্তরণ
৪। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৮ সালে মানবাধিকার সনদ ঘোষনা
৫। উন্নয়নে অবদান: MDG বাস্তবায়ন,SDG প্রণয়ন, UNDP
প্রতিষ্ঠা
৬। পরিবেশ সংরক্ষনে: UNFCCC
৭। শিশু ও নারী অধিকার রক্ষণ: CEDAW প্রতিষ্ঠা, ইউনিফেম
প্রতিষ্ঠা
৮। স্বাস্থসেবা: WHO গঠন
৯। শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা: ILO গঠন
১০। আন্তর্জাতিক আইন: আন্তর্জাতিক বিচারালয় প্রতিষ্ঠা
১১। পরমানু অস্ত্র বিস্তার রোধ: ১৯৬৮ সালে NPT, ১৯৯৬
সালে CTBT, IAEA গঠন
১২। বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষন: UNESCO
১৩। বিশ্ব বানিজ্য : WTO গঠন
.
ব্যর্থতাসমূহ :
১। মধ্যপ্রাচ্য শান্তিরক্ষায় ব্যর্থতা
২। মধ্যপ্রাচ্ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ
৩। ইরাক, আফগান, প্যালেস্টাইনে আগ্রাসন রোধে ব্যর্থ
৪। কসোভো, আলবেনীয়তে জাতিগত সমস্যা নিরসনে
ব্যর্থ
৫। বসনিয়া সংকট সমাধানে ব্যর্থ
৬। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থতা
৭. নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ (উত্তর কোরিয়া, ইসরাইল)
৮.জাতিসংঘে USA এর প্রাধান্য, ইত্যাদি।
.
.
★ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ :
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (United Nations General Assembly
(UNGA/GA) জাতিসংঘের ৬টি শাখার মধ্যে সর্বাপেক্ষা
প্রতিনিধিত্বমূলক অঙ্গসংস্থা। জাতিসংঘকে যদি একটি সরকাররূপে
বিবেচনা করা হয় তাহলে সাধারণ পরিষদ হল তার জনপ্রিয় কক্ষ,
মূল আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্র। এটিই একমাত্র পরিষদ
যেখান জাতিসংঘের সদস্যভূক্ত সকল রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও
প্রতিনিধিত্বের অধিকারী হিসেবে অবস্থান করে। তাই সাধারণ
পরিষদকে ‘বিশ্বমানবের সংসদ’নামে অভিহিত করা হয়।
.
★ গঠন :
জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত
হয়েছে। প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্র সাধারণ পরিষদে ৫ জন করে
প্রতিনিধি প্রেরণ করতে পারে। কিন্তু সদস্য দেশগুলোর
প্রত্যেকেই সভায় উত্থাপিত কোন বিষয়ের উপর কেবল
একটিমাত্র ভোট প্রয়োগ করতে পারে। সুতরাং এর দ্বারা
প্রমাণিত হয় যে, ক্ষুদ্র-বৃহৎ প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রই সমমর্যাদার
অধিকারী। তবে অনেকে মনে করেন যে, সাধারণ
পরিষদ বিশ্বের জনগণের প্রতিনিধি নয়; বিভিন্ন রাষ্ট্রের
সরকারের প্রতিনিধি মাত্র। সাধারণ পরিষদে প্রতিনিধিত্বকার
ী সদস্যগণ নিজ নিজ দেশের সরকারের প্রতিনিধি মাত্র। তাঁরা
সরকারের বক্তব্যই সাধারণ পরিষদের নিকট পেশ করেন।
.
★ অধিবেশন ও আলোচ্যসূচি :
সাধারণ পরিষদ হল ‘বিশ্বের মহাপরিষদ’ বিশেষ। প্রতি বৎসর
সেপ্টেম্বর মাসের ৩য় মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের
সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বসে। সাধারণত
ডিসেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত ঐ অধিবেশন চলে।
প্রয়োজনবোধে ‘বিশেষ অধিবেশন’ এবং ‘বিশেষ জরুরি
অধিবেশন’ আহ্বানের ব্যবস্থা আছে। সনদের ২০ নং ধারা
অনুসারে নিরাপত্তা পরিষদের ৯ জন সদস্য অথবা জাতিসংঘের
সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মতি নিয়ে একজন
সদস্যের অনুরোধে মহাসচিব ২৪ ঘণ্টার বিজ্ঞপ্তি মারফত
বিশেষ জরুরি অবস্থাজনিত পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের
বিশেষ জরুরি অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনেই কখনো
কখনো এই ধরনের বিশেষ জরুরি অধিবেশন আহ্বান
অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ১৯৫৬ এবং ১৯৫৮ সালে যথাক্রমে
সুয়েজ ও হাঙ্গেরি সঙ্কট, জর্ডান এবং লেবাননের সঙ্কট
মোকাবিলায় এবং ১৯৫০ সালে ‘শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হবার
প্রস্তাব’ গ্রহণের জন্য পরিষদের বিশেষ জরুরি অধিবেশন
আহ্বান করা হয়েছিল।
প্রত্যেক অধিবেশনের শুরুতে অধিকাংশ সদস্যের
ভোটে একজন সভাপতি বার্ষিক ভিত্তিতে নিযুক্ত হন। অতঃপর
তাঁর মাধ্যমেই সভার কর্মসূচী গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম
পরিচালিত হয়। সভাপতি আলোচ্যসূচি নির্ধারণ করেন। অধিকাংশ
সদস্য রাষ্ট্রের ভোটে যে-কোনরূপ সিদ্ধান্ত গৃহীত
হয়। ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হল, লন্ডন ছিল ১৯৪৬ সালে
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম সভার স্থল।
.
★ কার্য পরিচালনার পদ্ধতি :
প্রতিটি অধিবেশনের পূর্বে সাধারণ পরিষদ সদস্যগণ
নিজেদের মধ্যে থেকে একজন সভাপতি (President), ২১
জন সহ-সভাপতি এবং সাধারণ পরিষদের ৭টি মুখ্য কমিটির
চেয়ারম্যানদের নির্বাচিত করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন
অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য
সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ৫টি অঞ্চল
থেকে আবর্তনশীলতার নীতির ভিত্তিতে প্রতিবছর সাধারণ
পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই ৫টি অঞ্চল হল : আফ্রিকা,
এশিয়া, পূর্ব-ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও পশ্চিম
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। সাধারণ পরিষদের প্রতিটি
অধিবেশনে কর্মসূচিগুলি অনুমোদনের জন্য পেশ
করতে হয়।
.
★ ভোটদানের পদ্ধতি :
জাতিসংঘ সনদের ১৮ নং ধারায় ভোটদানের পদ্ধতি সম্পর্কে
আলোচনা আছে। সাধারণ পরিষদের প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের
একটি করে ভোট আছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত
গ্রহণের জন্য সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন
প্রয়োজন। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে
আছে: আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সুপারিশমূলক
প্রস্তাব গ্রহণ, নিরাপত্তা পরিষদের ১০ জন অস্থায়ী
সদস্যের নির্বাচন, অছি পরিষদ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক
পরিষদের সদস্যদের নির্বাচন, জাতিসংঘের নতুন সদস্যপদ
প্রদান, সদস্যপদের অধিকার ও সুযোগসুবিধা বাতিল, সদস্যকে
বহিষ্কার, অছি ব্যবস্থা-বিষয়ক প্রশ্নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
এবং বাজেট-সম্পর্কিত প্রশ্নাদি। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে
সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
.
★ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি :
জাতিসংঘ সনদের ৯নং অনুচ্ছেদ থেকে ২২নং অনুচ্ছেদে
বর্ণিত বিষয়াবলীর আলোকে সাধারণ পরিষদের গঠন,
ক্ষমতা, কার্যাবলী ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে নীচের
কাজগুলো সম্পাদন করে থাকে:
.
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা-বিষয়ক কার্যাবলি :
কোন রাষ্ট্র বা সদস্য রাষ্ট্র কর্তৃক শান্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত
যে-কোন বিষয় সাধারণ পরিষদে প্রেরণ করা যায়। প্রেরিত
বিষয় পরিষদ কর্তৃক পর্যালোচনা করার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা
পরিষদে প্রেরণ করা হয়। সনদে আন্তর্জাতিক শান্তি ও
নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদকে ন্যস্ত করা
হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদকে আলোচনা
ও সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে।
সনদের ১১(২) নং ধারা অনুসারে সাধারণ পরিষদ তার নিকট উত্থাপিত
আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তা রক্ষাবিষয়ক যে-কোনো
প্রশ্ন আলোচনা করতে পারে। সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক
শান্তি এবং নিরাপত্তাবিঘœকারী কোনো পরিস্থিতির বিষয়ে
নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে [১১(৩) নং
ধারা]।
তবে নিরাপত্তা পরিষদ যদি ভেটো প্রয়োগের দরুন
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয়
তাহলে সাধারণ পরিষদ ১৯৫০ সালের ৩ নভেম্বর গৃহীত
‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে
পারবে।
.
আর্থিক এবং বাজেট-সংক্রান্ত ক্ষমতা :
সনদের ১৭ নং ধারা অনুসারে জাতিসংঘের বাজেট পাস করা এর
অন্যতম কাজ। এছাড়া শাখা সংস্থার বাজেট পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ
অনুমোদন করে। পাশাপাশি সদস্যভূক্ত রাষ্ট্রসমূহের বার্ষিক
চাঁদার পরিমাণ স্থির করে।
আর্থিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের
কয়েকটি সীমাবদ্ধতা আছে। সাধারণ পরিষদ কোনো
সদস্যকে তার দেয় অর্থ দিতে বাধ্য করতে পারে না। এর
ফলে সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং জাতিসংঘ প্রশাসনিক ব্যয়ভার বহন ও
অন্যান্য উন্নয়নমূলক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তীব্র
সমস্যার সম্মুখীন হয়। ৮০-এর দশকে জাতিসংঘের আর্থিক
অবস্থা এক চরম সংকটজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। ১৯৮৬
সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দেয় ২১০ মিলিয়ন ডলারের
মধ্যে ১১০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রাখে। তৎকালীন মহাসচিব
পেরেজ দ্য ক্যুয়েলারের উদ্যোগে ব্যয়-
সংকোচের নীতি অনুসরণের ফলে ৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়
সংকোচন সম্ভব হয়।
.
সদস্য গ্রহণ ও বহিষ্কার :
নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে যে-কোন রাষ্ট্রকে
নতুন সদস্যরূপে গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি পুরাতন যে-
কোন সদস্য রাষ্ট্রকে সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে বহিষ্কার
করতে পারে।
.
সংস্থা গঠনের ক্ষমতা :
জাতিসংঘের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে এবং তার উদ্দেশ্য
ও লক্ষ্য রূপায়ণের জন্য সাধারণ পরিষদ সহযোগী সংস্থা
গঠন করতে পারে। আণবিক শক্তি কমিশন, শান্তি পর্যবেক্ষণ
কমিশনসহ কয়েকটি সহযোগী সংস্থা সাধারণ পরিষদ কর্তৃক
গঠিত হয়েছে।
.
সনদ সংশোধন :
সনদ সংশোধনের কোনো প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদের
সম্মতিক্রমে এবং সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের
সম্মতি লাভ করলে কার্যকরী হয়। তবে নিরাপত্তা পরিষদের
সম্মতি বলতে পাঁচজন স্থায়ী সদস্যসহ অন্তত নয়জনের
সম্মতি থাকা প্রয়োজন। জাতিসংঘের নতুন সদস্যভুক্তি এবং
বিদ্যমান সদস্যদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদকে
ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে।
.
সুপারিশের ক্ষমতা :
সনদের ১৩ নং ধারা অনুসারে আন্তর্জাতিক আইনের
প্রগতিশীল বিকাশ ও সংকলনে উৎসাহদান এবং রাজনৈতিক
ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসার, অর্থনৈতিক,
সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক
সহযোগিতার প্রসারসাধন এবং জাতি, স্ত্রী-পুরুষ, ভাষা ও ধর্ম-
নির্বিশেষে সকলের জন্য মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতার
উপলব্ধিতে সাহায্যদানের জন্য সাধারণ পরিষদ সুপারিশ করতে
পারে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সাধারণ
কল্যাণ ব্যাহত করতে পারে-এমন বিষয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে
বিরোধ-মীমাংসার সুপারিশ করতে পারে।
.
নির্বাচনমূলক কার্যাবলি :
সাধারণ পরিষদ নিরাপত্তা পরিষদের ১০ জন অস্থায়ী সদস্য,
অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ৫৪ জন সদস্যকে নির্বাচিত
করে। আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের ১৫ জন বিচারপতি সাধারণ পরিষদ
নির্বাচিত করে। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচিত করে।
.
অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণ-সম্পর্কিত ক্ষমতা :
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য নিরস্ত্রীকরণ এবং
অস্ত্রসীমিতকরণের বিষয়ে সদস্যরাষ্ট্র অথবা নিরাপত্তা
পরিষদ কিংবা উভয়ের নিকট সাধারণ পরিষদ সুপারিশ করতে পারে
[১১(২) নং ধারা] .
কারিগরি এবং পরিবেশ-সংক্রান্ত কার্যাবলি :
মহাকাশ, সমুদ্রতলকে ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য
সাধারণ পরিষদের তৎপরতার কথা উল্লেখ করা যায়। এছাড়া
উপগ্রহের মাধ্যমে সম্প্রচার, প্রাকৃতিক সম্পদ সমীক্ষা,
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়নমূলক কাজে বিজ্ঞানের প্রয়োগ,
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিষয়
বিবেচনা, বিশ্ব পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য জাতিসংঘের
পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচি সাধারণ পরিষদের ভূমিকার নতুন দিগন্ত
উন্মোচিত করেছে।
.
প্রতিবেদন পর্যালোচনা :
জাতিসংঘের অন্যান্য শাখার কার্য্যের অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণ
করে। অন্যান্য শাখাগুলো সাধারণ পরিষদের নিকট বার্ষিক
প্রতিবেদন প্রদান করে। সাধারণ পরিষদ উক্ত প্রতিবেদন
পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে।
.
বিতর্ক ও আলোচনা :
সাধারণ পরিষদ হল ‘বিশ্বের বিতর্ক সভা’। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক,
আঞ্চলিক সমস্যাসহ সনদের বিভিন্ন অংশে সাধারণ পরিষদকে
সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে-সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে
সেই সকল বিষয়ে এই সংস্থায় আলোচনা এবং বিতর্ক অনুষ্ঠিত
হয়। মানবজাতির স্বার্থের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয় এই
পরিষদে আলোচিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে জনমত
গঠিত হবার সুযোগ এবং অবকাশ সৃষ্টি হয়। তবে সাধারণ পরিষদ
কোনো রাষ্ট্রের ‘ঘরোয়া বা অভ্যন্তরীণ’ ( Domestic
Affair) বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে না।
.
বিরোধ মীমাংসা :
বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে সাধারণ পরিষদ
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পারস্পরিক
সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যাতে ছিন্ন হলে সংস্থাটি
শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করে।
.
.
★ শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব :
১৯৫০ সালের ৩ নভেম্বর ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’
গৃহীত হবার পর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব সাধারণ
পরিষদকে গ্রহণ করতে হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ যদি
ভেটো প্রয়োগের দরুন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা
রক্ষার দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয় তাহলে সাধারণ পরিষদ
এক্ষেত্রে এই প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে
পারবে।
.
★ ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’- এর মূল বিষয়বস্তু :
১) শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হবার প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে,
স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের জন্য যদি নিরাপত্তা
পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে
নিজের প্রাথমিক দায়িত্বপালনে ব্যর্থ হয় অথচ শান্তি প্রতিষ্ঠার
ক্ষেত্রে ভীতিপ্রদর্শন, শান্তিভঙ্গ অথবা আগ্রাসনমূলক
ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ
পরিষদ সদস্যরাষ্ট্রগুলির নিকট যৌথব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ
করতে পারে। শান্তি লঙ্ঘন এবং আগ্রাসনমূলক ক্রিয়াকলাপ
প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা অথবা
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের জন্য
প্রয়োজনবোধে সাধারণ পরিষদ সশস্ত্রবাহিনী ব্যবহার
করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের
কোনো অধিবেশন না থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ
জরুরি অধিবেশন আহ্বানের ব্যবস্থা করা যাবে।
২) ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’- এ ১৪টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে
গঠিত শান্তি-পর্যবেক্ষণ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এই কমিশন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর বিশ্বের যে-
কোনো অংশের বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে
প্রতিবেদন পেশ করবে।
৩) প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, নিরাপত্তা পরিষদ অথবা সাধারণ
পরিষদের আহ্বানে জাতিসংঘের সকল সদস্যরাষ্ট্রে তাদের
সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষার প্রয়াসে নিয়োগের
জন্য প্রস্তুত থাকবে।
৪) ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব ’-এ সব বিষয় পর্যালোচনা এবং
তার ওপর প্রতিবেদন পেশ ও আন্তর্জাতিক শান্তি এবং
নিরাপত্তার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে সুপারিশ
করার জন্য ১৪টি রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি ‘যৌথ ব্যবস্থা গ্রহণ
বিষয়ক কমিটি’ গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে।
.
★ ‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ কিভাবে সাধারণ পরিষদের মর্যাদা
বৃদ্ধি ও এর এখতিয়ার সম্প্রসারিত করেছে?
‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ সাধারণ পরিষদের এখতিয়ার
সম্প্রসারিত এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। এই প্রস্তাব
অনুসারে সাধারণ পরিষদ দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। ‘যৌথ নিরাপত্তার’
ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের ভূমিকা এখন আর নিরাপত্তা
পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মুখাপেক্ষী নয়।
এ-যাবৎকাল বেশ কয়েকবার সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক
ক্ষেত্রে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতাকে প্রয়োগ
করেছে। ঐ প্রস্তাব অনুসারে ১৯৫৬ সালে সুয়েজ এবং
হাঙ্গেরির সংকটে সাধারণ পরিষদের বিশেষ জরুরি সভা আহ্বান
করা হয়। সুয়েজ-সংকট মোকাবিলা করার জন্য সাধারণ পরিষদ
জাতিসংঘের জরুরি বাহিনী গঠন করে। ১৯৫৮ সালে জর্ডান এবং
লেবাননের সংকট সমাধানের জন্য ‘শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ
হবার প্রস্তাব’ অনুসারে সাধারণ পরিষদ উদ্যোগ গ্রহণ
করেছে।
.
‘শান্তির জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ সনদের মৌলিক পরিবর্তন
ঘটিয়েছে। কারণ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা
এককভাবে সনদপ্রণেতাগণ নিরাপত্তা পরিষদকেই ন্যস্ত
করেছে। ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্য প্রস্তাব’ কার্যকর করার
জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ৫ জন স্থায়ী সদস্যের সম্মতি
প্রয়োজন হয় না। এর ফলে একদিকে যেমন সমস্যা সৃষ্টির
সম্ভাবনা হ্রাস পায়, তেমনি অন্যদিকে বৃহৎ শক্তির মধ্যে
বিরোধের পরিস্থিতি গড়ে ওঠে। কারণ, ৫টি স্থায়ী
সদস্যরাষ্ট্রের সম্মতি অনুসারে কোনো প্রস্তাব গৃহীত
হলে তা কার্যকর করার জন্য কোনো সমস্যাই থাকে না।
সাধারণ পরিষদের দায়িত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরন্তু ১৯১
সদস্যবিশিষ্ট সাধারণ পরিষদের পক্ষে প্রয়োজন অনুযায়ী
অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ ও
ব্যবস্থা অবলম্বন সম্ভব নয় বলে অনেকে মনে করেন।
.
===================
উত্স ও তথ্যসূত্র :
যায় যায় দিন, ২৪ অক্টোবর ২০০৮
নেসার আমিন, লেখক ও উন্নয়নকর্মী
তোফাজ্জল হোসেন, কবি ও লেখক
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ
“History of the United Nations 1941 – 1950” United
Nations
(পত্রিকা, আর্টিকেল, ওয়েব, ব্লগ থেকে সংগৃহীত ও
সম্পাদিত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share